
হাবিবুর রহমান (বাপ্পি): রাজধানীর মতিঝিলসংলগ্ন বাসাবো, খিলগাঁও, মগবাজার, রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ছিনতাই ও হত্যাসহ নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এসব এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন কিছু গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধে ব্যবহার করা হলে প্রচলিত আইনের সুযোগে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অপরাধী চক্রগুলো কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা আড়ালে থেকে যায় এমন অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অপরাধী চক্রের প্রভাব রয়েছে। বাসাবো, খিলগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী ও বাড্ডার বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধচক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, এলাকায় অপরাধের শিকার হলেও অনেকেই পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে ভয় পান। তাঁর অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ থাকায় ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকার বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জমি দখল ও জমি কেনাবেচার ব্যবসার সম্পর্ক রয়েছে। খাল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল দখল বা ভরাটের ফলে রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তাঁরা। সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার সঙ্গে এসব অব্যবস্থাপনার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাড্ডার কাছে আসিয়ান সিটি প্রকল্পের জমি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও হত্যার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কাউন্সিলর কাইয়ূমের নেতৃত্বে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোরদেরও দেখা যায়। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে জমি বিক্রি ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে খিলগাঁও, রামপুরা, বাড্ডা ও বনশ্রী এলাকায় সুজন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাঁকে স্বাধীন রুমী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেন।
বনশ্রী এলাকার একটি জমি কেনাবেচা প্রতিষ্ঠানে সুজন ও তাঁর সহযোগীদের প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের দাবি, জমি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রভাব ব্যবহার করে এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ব্যবসায়িক বিরোধে প্রতিপক্ষকে চাপ প্রয়োগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার এবং পুলিশের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে সুজনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুজনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, হাবিব নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, সুজনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে একটি জমি বিক্রির লেনদেনে তাঁর পাওনা ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে না এবং যোগাযোগ করেও তিনি সন্তোষজনক সাড়া পাচ্ছেন না।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিযোগকারীদের দাবি, সুজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
Leave a Reply