
নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আসন্ন কোরবানির পশুর হাট ইজারা প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম, দুর্নীতি এবং যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে, কোনো ধরনের অফিসিয়াল গেজেট বা স্বচ্ছ ঘোষণা ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পছন্দের সিন্ডিকেটকে হাট পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ এখন তুঙ্গে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চারটি প্রধান হাটের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র, যেখানে সিটি কর্পোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ রয়েছে বিশেষ প্রভাবশালী মহলের।
বাড্ডা থানার আওতাধীন স্বদেশ প্রপার্টির খালি জায়গায় হাটের সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। এখানে মোট চারটি টেন্ডার জমা পড়ে, যেখানে অদ্ভুত সব তথ্য উঠে এসেছে। এ্যামাবা ট্রেড অ্যাসোসিয়েট এর পক্ষ থেকে ফাহিম মোহাম্মদ আকিল মাহমুদ সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা বিড করেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এর বিপরীতে কোনো পে-অর্ডার জমা দেননি। নিয়ম অনুযায়ী পে-অর্ডার ছাড়া টেন্ডার বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও এটি প্রক্রিয়ায় রাখা হয় অন্য উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। এই হাটের জন্য তুহিনুল ইসলাম ২ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা বিড করে ৭০ লক্ষ টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। এছাড়া মোহাম্মদ মেহেদী মাসুদ রানা ৯১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিড করে ২৯ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার এবং মোঃ ওমর ফারুক ৭১ লক্ষ টাকা বিড করে ২১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। সচেতন মহলের অভিযোগ, ফাহিম মাহমুদের ৭ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার ভুয়া বিডটি করা হয়েছে মূলত বড় অংকের টাকার লোভ দেখিয়ে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দিতে, যাতে শেষ পর্যন্ত পর্দার আড়ালের কেউ সুবিধা পায়। এখানে উচ্চ মূল্য দেখিয়ে হাট পেয়েছেন তুহিনুল ইসলাম সেখানেও করেছেন চরম কারসাজি। এই হাটের সেকেন্ড পজিশনে থাকা মেহেদী মাসুদ বলেন, ভুয়া পে-অর্ডার দিয়ে এই হাটটি নেওয়া হয়েছে এবং ঐ পে অর্ডারের বিপরীতে ব্যাংক একাউন্টে কোন টাকা নেই এসকল বিষয় নিয়ে সম্পত্তি কর্মকর্তাকে জানালে তিনি আমাকে জানায় তাদের ৩ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে টাকা জমা দেওয়ার। উক্ত বিষয়ে তুহিনুল ইসলামকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি।
বড় বেড়াইদ বা বসুন্ধরার ভেতরের খালি জায়গায় হাটের জন্য সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ১ কোটি টাকা। এখানে তিনটি টেন্ডার জমা পড়ে। এএম এন্টারপ্রাইজ নামে আতাউর রহমান ৫ কোটি ৭ লক্ষ টাকা বিড করেন এবং ১ কোটি ৫২ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেন। মাহমুদ হাসান মুনির নামের আরেকটি টেন্ডার জমা পড়ে ১ কোটি ৮২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার এবং পে-অর্ডার হয় ৫৪ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার। একই হাটের জন্য মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম নামে আরেকটি টেন্ডার জমা পড়ে ১ কোটি ২১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার, যার পে-অর্ডার ছিল ৩৬ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা। এখানে সরকারি মূল্যের চেয়ে ৫ গুণ বেশি দাম হাঁকানো হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ রয়ে গেছে। এখানেও সেকেন্ড পজিশনে থাকা মাহমুদ হাসান মুনির অভিযোগ করেন ভুয়া পে-অর্ডারের মাধ্যমে হাটটি নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের কোষাগারে আজকে পর্যন্ত তাদের টাকা জমা হয়নি। আমরা প্রকৃত টাকা জমা দিয়েও কারসাজিতে পরে গিয়েছি। আজকেও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বললেন তাদের টাকা ৩ দিনের মাঝে জমা না পরলে আপনারাই হাট করবেন। এখন আমার প্রশ্ন, তিনি যে বললেন তারা টাকা জমা না দিলে আমরা হাট করবো, এখানে হুট হাট করে কি এত বড় হাট করা সম্ভব আর ঈদের ২ দিন আগে কি,এটা সম্ভব? এটা একটা আইওয়াশ মাত্র। এখানে শুভংকরের ফাকি দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ডিএনসিসির রহস্যজনক নীরবতা।
প্রবাসী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর তার ফেসবুক ষ্টেটাসে জানায়, ভাটারা থানার আলোচিত বিএনপি নেতা আতাউর রহমান , যিনি উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমানের ঘনিষ্ঠ, তারই প্রতিষ্ঠান পেয়েছে এই হাটের ডাক। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া উচ্চ মূল্যের পে-অর্ডারটি নিয়ম মাফিক সরকারী ঘোষনা বা অনলাইনে গেজেট না হওয়ায় আভ্যন্তরীন নিকোর মাধ্যমে পরবর্তীতে কমিয়ে দেয়া হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় যে, পে-অর্ডারের মাধ্যমে আতাউর রহমান হাট পেয়েছেন সেই পে-অর্ডার সম্পূর্ণ ভুয়া।
বনরুপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গায় পশুর হাটের জন্য সরকারি ভিত্তি মূল্য ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে এই হাটের জন্য মাত্র একটি টেন্ডার জমা পড়ে। আরিফিন এন আরাফ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ভিত্তি মূল্যের চেয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ১০ হাজার টাকা বিড করে। নিয়ম অনুযায়ী, মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়লে পুনরায় টেন্ডার ডাকার বিধান থাকলেও, এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিডের বিপরীতে ৫৪ লক্ষ ৩ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়। একক দরদাতার মাধ্যমে হাটটি চূড়ান্ত করার এই প্রক্রিয়াকে সাজানো নাটক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহাখালী টিএনটি মাঠের হাটের ক্ষেত্রে দুর্নীতির চিত্র আরও ভয়াবহ। এই হাটের সরকারি ভিত্তি মূল্য ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। অথচ এখানে যে তিনটি টেন্ডার জমা পড়েছে, তার প্রতিটিই সরকারি মূল্যের অর্ধেকেরও কম। এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেডিং ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আহমেদ নামের আরেকজন ১৭ লক্ষ টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার করেন। একই হাটের জন্য আরেকটি কোম্পানি ১৬ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা বিড করে ৫ লক্ষ ১০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জমা দেয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই তিনটি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানই মূলত একই সিন্ডিকেটের সদস্য। সরকারি ভিত্তি মূল্য ৫০ লক্ষ টাকা হওয়া সত্ত্বেও কেন ১৭ লক্ষ টাকার ঘরে বিড গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে কোনো সদুত্তর নেই ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের। এটি স্পষ্টত একটি যোগসাজশের বিডিং, যেখানে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী, টেন্ডার খোলার পর সর্বোচ্চ দরদাতাকে সাময়িকভাবে নির্বাচিত করে সাথে সাথে অফিসিয়াল গেজেট প্রকাশ করার কথা। কিন্তু এই চারটি হাটের ইজারার জন্য ডিএনসিসি তাৎক্ষণিক কোনো গেজেট ইস্যু করে নাই। কে বা কারা সর্বোচ্চ বিড করে টেন্ডার পেয়েছে, তারও কোন অফিসিয়াল ডিক্লারেশন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে না দিয়ে এর পাঁচ দিন পরে গেজেট প্রকাশ করে। এদিকে নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের পর নির্ধারিত দিন থেকে হাট পরিচালনার কথা। অথচ ডিএসিসি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজসে নির্ধারিত দিনের তিন দিন আগে থেকেই হাট পরিচালনা করা হচ্ছে। যা রাষ্ট্রিয় আইন অনুযায়ী স্পষ্ট ভাবে অনিয়ম বা দুর্নীতি।
এসব বিষয়ে যুগান্তরের পক্ষ থেকে হাট পরিচালনাকারি ইজারাদারদের সাথে সরাসরি এবং ফোনে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। তারা ফোন রিসিভ করেনি।
ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্ত্বি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘এসব বিষয় রিভিউ কমিটি সিদ্ধান্ত নিবে। এ ব্যাপারে আমি কোন তথ্য দিতে পারব না।’ প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হাবিবুল আলম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমাকে কেউ অবগত করে নাই, সূতরাং আমি কোন তথ্য দিতে পারছি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, উপর মহল থেকে চাপ থাকায় অনেক সময় নিয়ম ভেঙে কম মূল্যের টেন্ডার গ্রহণ করতে হয়। আমরা এবার এমনো পে অর্ডার গ্রহণ করেছি যা সম্পূর্ণ ভূয়া এবং লোক দেখানো। উপরের মহলের নির্দেশে আমারা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি। উপরের মহলের কারা , জানতে চাইলে তিনি বলেন তার চাকরি থাকবে না। তবে তাৎক্ষণিক গেজেট ছাড়া হাট বরাদ্দ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্র জানায়, সরকারি সম্পদ ইজারার ক্ষেত্রে ভিত্তি মূল্যের নিচে বিড গ্রহণ এবং গেজেট প্রকাশ না করা গুরুতর অপরাধ। পশুর হাটের এই ইজারা প্রক্রিয়া সাধারণ কোনো অনিয়ম নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত লুণ্ঠন। যেখানে ভিত্তি মূল্যের নিচে বিড হওয়া সত্ত্বেও টেন্ডার বাতিল করা হচ্ছে না এবং অবাস্তব দাম হাঁকিয়ে পে-অর্ডার না দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। ডিএনসিসি যদি অনতিবিলম্বে এই টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে স্বচ্ছতার সাথে পুনরায় দরপত্র আহ্বান না করে, তবে সরকার কয়েক কোটি টাকার নিশ্চিত রাজস্ব হারাবে।
Leave a Reply