
নিজস্ব প্রতিবেদক: এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুন নেওয়াজ ও ভাইস চেয়ারম্যান মইনউদ্দিন মোনেমের বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত ও ব্যাংক পরিচালনায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো তাঁদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতে প্রশ্ন উঠেছে, গুরুতর অভিযোগের পরও কীভাবে তাঁরা ব্যাংকের শীর্ষ পদে বহাল রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নুরুন নেওয়াজের মালিকানাধীন অর্কিড এনার্জি লিমিটেডের এলপিজি স্থাপনা অধিগ্রহণের জন্য ২৬ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করা হয়। আবেদনে ১৬ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ এবং ১০ কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ঋণ প্রস্তাবটি এনসিসি ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার গ্রাহক রাজ্জাক এন্টারপ্রাইজের নামে উপস্থাপন করা হলেও প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে নুরুন নেওয়াজের মালিকানাধীন অর্কিড এনার্জি লিমিটেডের বিষয়টি গোপন করা হয়। অর্কিড এনার্জির মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে নুরুন নেওয়াজ, তাঁর ছেলে সাজ্জাদ উন নেওয়াজ এবং স্ত্রী শাহিদা নেওয়াজের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, নুরুন নেওয়াজ তখন ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। ফলে নিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে নথিপত্রসহ অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক পরিচালক নিজের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় থাকেন। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকানা বা স্বার্থের তথ্য গোপন করে ঋণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়ে থাকলে বিষয়টি গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এদিকে নুরুন নেওয়াজের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ক্রয়, টেন্ডার ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ব্যাংকের বিভিন্ন ভবন ও শাখায় তাঁর মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্য বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে সরবরাহ করা হয়েছে। বিশেষ করে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) সরবরাহে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্রের দাবি, নুরুন নেওয়াজের বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ১৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কার্যালয় থেকে তদন্ত করে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় চেয়ারম্যান নির্বাচনের বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হয়।
ওই সভায় কয়েকজন পরিচালক তদন্তের অগ্রগতি ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে নুরুন নেওয়াজকে চেয়ারম্যান এবং আবদুল মোনেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মইনউদ্দিন মোনেমকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
মইনউদ্দিন মোনেমের বিরুদ্ধেও ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে। তাঁর মালিকানাধীন বা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়েছে বলে ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইগলু-সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে বিরোধ ও আইনগত জটিলতার তথ্যও রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে ব্যাংকের পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে বহাল রয়েছেন।
এনসিসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নুরুন নেওয়াজের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের মধ্যে খায়রুল আলম চাকলাদার, সাজ্জাদ উন নেওয়াজ ও আবদুস সালামের ভূমিকা নিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে তথ্য চাওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নুরুন নেওয়াজ ও ভাইস চেয়ারম্যান মইনউদ্দিন মোনেমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো ব্যাংকের পরিচালক বা শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাত, ঋণ অনিয়ম বা ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকলে বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তা স্পষ্ট করা- দুই ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
Leave a Reply