
ফরিদুল আলম ফরিদ: দীর্ঘ সাত বছর পর গত ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন। তবে ভোটগ্রহণের ঠিক দুই দিন আগে হাইকোর্টের এক আদেশে স্থবির হয়ে যায় পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী দুই মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন।
এফবিসিসিআই সালিশ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। আদালত থেকে এই ধাক্কা আসার পর থেকেই সিনেমার পর্দার পেছনের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেল একে অপরের বিরুদ্ধে দায় চাপাচ্ছেন।
এবারের নির্বাচনে ২১টি পদের বিপরীতে দুটি প্যানেল থেকে মোট ৪২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এক পক্ষে রয়েছেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল ও কামাল মোহাম্মদ কিবরিয়া লিপু প্যানেল এবং অন্য পক্ষে খোরশেদ আলম খসরু ও শামসুল আলম প্যানেল। অভিনেতা উজ্জ্বলের করা রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত আদালত এই স্থগিতাদেশ দেন। এরপর থেকেই দুই প্যানেল জড়িয়ে পড়েছে বাগযুদ্ধে।
উজ্জ্বল-লিপু প্যানেলের দাবি, সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী খোরশেদ আলম খসরু এবং শামসুল আলম ইতোমধ্যে টানা দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এবার তারা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। ভোটার তালিকা ও প্রার্থী বাছাইয়ের এই অনিয়ম দূর করতেই তারা আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।
খসরু-শামসুল প্যানেলের পাল্টা যুক্তি, নির্বাচন বানচাল করতেই প্রতিপক্ষ শেষ মুহূর্তে এসে আইনি জটিলতা তৈরি করেছে। তাদের মতে, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর এবং ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচন স্থগিত করা সাধারণ ভোটার ও প্রযোজকদের অধিকার খর্ব করার শামিল।
সম্প্রতি আইনগত অবস্থান তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলন করে উজ্জ্বল-লিপু পরিষদ। সেখানে তারা জানান, সমিতির গঠনতন্ত্রে কার্যনির্বাহী কমিটিতে সদস্য হিসেবে ধারাবাহিক মেয়াদসংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা প্রয়োজন। এই বিধানের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়েই বর্তমানে বিভিন্ন আইনগত প্রশ্ন এবং বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৬-২৮ মেয়াদের নির্বাচনে দুইজন প্রার্থীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে
নির্বাচন কমিশন ও আপিল কমিশনের ভিন্নমুখী সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি নিয়ে এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আমরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হই।
তারা আরো জানান, আমাদের দায়েরকৃত আবেদনের (আবেদন নং-১০৮৫৬) শুনানি শেষে উচ্চ আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে পূর্ববর্তী মামলাগুলোর নিষ্পত্তির আলোকে দুই মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিতের আদেশ প্রদান করেছেন। আমরা আদালতের এই আদেশকে সম্মান জানাই এবং বিশ্বাস করি, বিচারাধীন বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় আইনগত জটিলতা ও সাংগঠনিক বিরোধ এড়ানো সম্ভব হবে।
উজ্জ্বল-লিপু পরিষদ জানায়, আমাদের এই বক্তব্য কোনো ব্যক্তি বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে নয়। আমরা কেবল একটি আইনসম্মত, স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং গঠনতন্ত্রসম্মত নির্বাচন নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমরা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন, আপিল কমিশন, এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আদালতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে আশা করি, প্রযোজ্য আইন ও গঠনতন্ত্রের আলোকে সকল প্রশ্নের নিষ্পত্তি হবে এবং পরবর্তীতে একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিতর্কমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রযোজক সমিতির সাধারণ সদস্যদের মতে, এই আইনি লড়াই ঢালিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির জন্য কোনো ভালো বার্তা আনছে না। সমিতির সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৭ জুলাই। এরপর থেকে ভোটার তালিকা, গঠনতন্ত্র সংস্কার এবং একজন প্রযোজক, একটি ভোট নীতি চালুর জটিলতায় ২০২২ সালেও একবার শেষ মুহূর্তে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল।
নতুন তপশিল অনুযায়ী প্রথমে ১১ জুলাই এবং পরে ৮ আগস্ট ভোটের দিন চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বারবার আদালতের দরজায় কড়া নাড়ায় প্রযোজকদের অভিভাবক সংগঠনটি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ছে, যা নতুন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিবেশনায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আপাতত আরও দুই মাসের জন্য ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই শীর্ষ সংগঠনের ভবিষ্যৎ ঝুলে রইল আদালতের বারান্দায়।

Leave a Reply