
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চলমান দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম দিনেই বাংলাদেশ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করার পর দেশজুড়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এবার হয়তো বড় কিছু করে দেখাতে পারবে বাংলাদেশ।
প্রতিটি দিন গড়ানোর সঙ্গে সেই প্রত্যাশা আরও বাড়তে থাকে। তবে এর মাঝেই এক ধরনের ভয়ও ধীরে ধীরে ভর করতে শুরু করে। অনেকের মনে হচ্ছিল, এই আনন্দ হয়তো বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষে যখন অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেট হাতে রেখে বাংলাদেশের চেয়ে ৬৭ রানে পিছিয়ে থেকে দিন শেষ করে, তখন দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক পক্ষ মনে করছিল, বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানেই অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারে। অন্য পক্ষের ধারণা ছিল, অস্ট্রেলিয়া যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০ থেকে ১৫০ রানের লিড নিতে পারে, তাহলে সেই চাপ সামলানো বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপেই ভেঙে পড়তে পারে দল।
এই আশঙ্কার অবশ্য ভিত্তি ছিল। অতীতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থেকেও বাংলাদেশ টেস্ট হেরেছে।
২০০৩ সালে বাংলাদেশের সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়া সফরে দলের অধিনায়ক থাকা সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ ক্রিকবাজকে জানান, বাংলাদেশের একটি অংশের মধ্যে এমন আশঙ্কা ছিল যে কোনো এক পর্যায়ে দল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। তবে তিনি নিজে কখনো এমনটা ভাবেননি। তার বিশ্বাস ছিল, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশ বদলেছে এবং বর্তমান দল চাপ সামলানোর জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।
মাহমুদ বলেন, ‘কেউ কেউ বলছিল, অস্ট্রেলিয়া যদি ১৫০ রানের লক্ষ্য দেয়, তাহলে বাংলাদেশ জিততে পারবে না। কিন্তু আমি মোটেও সন্দিহান ছিলাম না। উইকেট দেখে আমার মনে হয়নি বাংলাদেশের ভালো করার কোনো কারণ নেই। অবশ্যই বল কিছুটা লাফাচ্ছিল। কিন্তু শুধু লাফানো আমাদের জন্য সমস্যা নয়। গতি ও লাফ একসঙ্গে থাকলেই সেটা কঠিন হয়ে যায়। এই উইকেটে সেই ধরনের গতি ছিল না। দ্বিতীয় দিনে তাসকিন ও অন্যরা যখন উইকেটের ওপর দিয়ে বল করে সরাসরি উইকেটরক্ষকের কাছে পৌঁছাচ্ছিল, তখনই তো বোঝা যাচ্ছিল উইকেটের আচরণ কেমন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমি কখনো দ্বিধায় ছিলাম না। আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, আমরা যদি ২০০ রানের বেশি লক্ষ্য দিতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ টেস্টটি জিততে পারবে। শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়েছে। তাছাড়া প্রতিপক্ষের ওপরও তো সবসময় চাপ থাকে। আমাদের বোলাররা এখন সত্যিই খুব ভালো করছে। আগে আমাদের বোলিং আক্রমণ দুর্বল ছিল বলে আমরা সমস্যায় পড়তাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। আমাদের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ আছে, যা অতীতে ছিল না।’
২০০৩ ও ২০২৬ সালের অস্ট্রেলিয়া দল এবং বাংলাদেশের দলের মধ্যে তুলনা করাটাও ঠিক হবে না বলে মনে করেন মাহমুদ। কারণ, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ছিল টেস্ট ক্রিকেটে একেবারেই নতুন এবং তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া।
মাহমুদ বলেন, ‘২০০৩ সালের অস্ট্রেলিয়া দলের সঙ্গে বর্তমান দলের আসলে তুলনা করা যায় না। ২০০৩ সালের সেই দলটি ছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তখন বাংলাদেশ ছিল অনভিজ্ঞ একটি দল। কিন্তু
আজকের খেলোয়াড়রা অনেক বেশি পরিণত, অভিজ্ঞ ও আত্মবিশ্বাসী। আমি কথাটি বলার পরও অনেকে আমার বক্তব্য ভুল বুঝেছিল। আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছিলাম, আমরা কতটা উন্নতি করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি অস্ট্রেলিয়াকে খাটো করছি না। কিন্তু এই দলটির সঙ্গে ২০০৩ সালের সেই দুর্দান্ত দলের তুলনা করাও ঠিক নয়। তখন অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ উইকেট নেওয়ার পরও অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ব্যাট করতে নামতেন। কিন্তু কেউ কেউ আমাদের প্রতিদিনের উন্নতিটা স্বীকার করতেই চান না।’
একই মত প্রকাশ করেছেন সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল। ঐতিহাসিক এই জয়ে বাংলাদেশকে প্রায় নিখুঁত একটি টেস্ট খেলতে দেখে তিনি আনন্দিত।
রোববার ঐতিহাসিক জয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তামিম বলেন, ‘আমার মনে হয় আমরা একটি নিখুঁত টেস্ট ম্যাচ খেলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব খেলোয়াড়ই অবদান রেখেছে। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এটি প্রমাণ করে, টেস্ট দল হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’
তামিমের দৃঢ় বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, এখন সময় এসেছে ক্রিকেটারদের ওপর আস্থা রাখার। তাদের প্রতিভা ও সামর্থ্য নিয়ে বারবার সংশয় প্রকাশ না করে বিশ্বাস রাখার সময় এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে দ্বিতীয় টেস্টে নামবে বাংলাদেশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জয় দীর্ঘদিন ধরে শঙ্কার চোখে বাংলাদেশকে দেখে আসা মানুষদের মধ্যেও প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস ও বিশ্বাস তৈরি করবে।
Leave a Reply