
বেলাবো (নরসিংদী) প্রতিনিধি: নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায় প্রায় চার দশক আগে সম্পন্ন হওয়া একটি জমি ক্রয়-বিক্রয় এবং পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো: গোলাম মোস্তফা গোলাপকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী, ভুক্তভোগী ও একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দারিদ্র্যের চাপে জমি বিক্রি, শুরু বিরোধের প্রেক্ষাপট
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার লোহাজুরী কান্দা গ্রামের বাসিন্দা আ: গফুর সরকার ১৯৭৭-৭৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী মমতাজ বেগম, ৫ ছেলে ও ৪ মেয়েসহ বড় একটি পরিবার রেখে যান। সে সময় পরিবারের অধিকাংশ সন্তানই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং উপার্জনের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকায় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।
পরিবারের টিকে থাকার তাগিদে ১৯৮১ সালে গফুর সরকারের স্ত্রী মমতাজ বেগম ও দুই সাবালক ছেলে চান মিয়া এবং শামসুল আলম বৈধ বায়নাপত্রের মাধ্যমে তাদের জমি মো: গোলাম মোস্তফা গোলাপের কাছে বিক্রি করেন। অভিযোগ বা বিরোধ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন বলে জানা যায়।
আদালতের মাধ্যমে মালিকানা নিষ্পত্তি
তবে জমির চূড়ান্ত দলিল বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব হওয়ায় ক্রেতা গোলাম মোস্তফা গোলাপ আদালতের শরণাপন্ন হন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ১৯৮৫ সালে বড় ছেলে চান মিয়া এবং ১৯৯৬ সালে স্ত্রী মমতাজ বেগম ও মেজ ছেলে শামসুল আলম পৃথক আপোষনামার মাধ্যমে জমির মালিকানা গোলাম মোস্তফা গোলাপের অনুকূলে হস্তান্তর করেন।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় এবং এরপর দীর্ঘ সময় কোনো ধরনের বিরোধ দেখা যায়নি।
৪৩ বছর পর নতুন করে বিরোধ, উঠছে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার দীর্ঘ ৪৩ বছর পর মৃত গফুর সরকারের ছোট ছেলেরা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুনরায় জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে একজন আইনজীবী হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি মো: গোলাম মোস্তফা গোলাপসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মামলা দায়ের করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “যে বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে, সেটিকে আবার নতুন করে মামলা দিয়ে সামনে আনা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না হয়ে পারে না।”
‘মামলা বাণিজ্য’ না ন্যায়বিচার- প্রশ্ন এলাকাজুড়ে
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এটি শুধুমাত্র জমি বিরোধ নয়; বরং আইনকে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি এবং হয়রানির একটি কৌশল। তারা বলছেন, বারবার মামলা দায়েরের মাধ্যমে একটি পক্ষকে আর্থিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আইনের অপব্যবহার করে যদি কাউকে চাপে রাখা হয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়, বরং এক ধরনের নির্যাতন।”
সামাজিক মীমাংসা ব্যর্থ
বিরোধ নিরসনে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস ও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযুক্ত পক্ষ তাতে অংশ নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং তারা আদালতকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকেই বেছে নিয়ে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এতে করে দীর্ঘদিনের একটি নিষ্পত্তিকৃত বিষয় আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য
সাবেক চেয়ারম্যান মো: গোলাম মোস্তফা গোলাপ বলেন, “আমি আইন মেনে জমি ক্রয় করেছি এবং আদালতের মাধ্যমেই মালিকানা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু এখন আমাকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অভিযুক্তদের বক্তব্য মেলেনি
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
সচেতন মহলের মতে, আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তিকৃত একটি বিষয় পুনরায় বিরোধে রূপ নেওয়া বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। একইসঙ্গে আইনের অপব্যবহার হলে সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
ঘটনাপ্রবাহ এক নজরে
১৯৭৭-৭৮: আ: গফুর সরকারের মৃত্যু
১৯৮১: জমি বিক্রি (বায়নাপত্র)
১৯৮৫: বড় ছেলে চান মিয়ার আপোষনামা
১৯৯৬: স্ত্রী ও মেজ ছেলের মাধ্যমে চূড়ান্ত মালিকানা হস্তান্তর
২০২৪-২৫: নতুন করে বিরোধ ও ধারাবাহিক মামলা
স্থানীয়দের দাবি
এলাকাবাসী ও সচেতন মহল মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
শেষ কথা
আইন মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য- কিন্তু সেই আইনই যদি হয়রানির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের ন্যায়বোধ।
Leave a Reply