শেষ বাঁশি বাজবে। কেউ ছুটবেন ফাইনালের আনন্দে, কেউ থমকে দাঁড়াবেন হতাশায়। কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরবেন, কেউ মাথা নিচু করে হাঁটবেন। সেই ভিড়ের মধ্যেই হয়তো ইংল্যান্ডের কোনো একজন ফুটবলারের চোখ থাকবে শুধু একটি জার্সির দিকে। আকাশি-সাদা ডোরাকাটা জার্সি। পিঠে লেখা মেসি। নম্বর ১০।
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। ম্যাচশেষে কে জিতবে, কে হারবে সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মাঠের এক কোণে তৈরি হতে পারে আরেকটি ছোট্ট গল্প। ইংল্যান্ডের কোনো খেলোয়াড় পাবেন লিওনেল মেসির জার্সি? এটিই যদি হয়ে যায় বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ, তাহলে সেই জার্সি হয়ে যাবে ইতিহাস।
ফুটবলে ম্যাচশেষে জার্সি বদলের রীতি বহু পুরোনো। নব্বই মিনিটের লড়াই শেষ হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেমে যায়। একজন আরেকজনের কাছে এগিয়ে যান। করমর্দন করেন। আলিঙ্গন করেন। তারপর খুলে দেন নিজের জার্সি। একজনের ঘামভেজা জার্সি চলে যায় আরেকজনের হাতে। যদিও সব জার্সির গল্প এক নয়। কিছু জার্সি ম্যাচশেষে কাপড় থেকে স্মৃতিতে বদলে যায়।
মেসির ১০ নম্বর জার্সিটির সামনে তেমনই এক সম্ভাবনা। বয়স ৩৯। বিশ্বকাপে তার শেষ অভিযান। সামনে ইংল্যান্ড। জিতলে ফাইনাল। হারলে শেষ। শুধু একটি ম্যাচের শেষ নয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির দীর্ঘ পথচলারও শেষ। তখন তার শরীর থেকে খুলে নেওয়া জার্সিটির মূল্য কী দিয়ে মাপা যাবে? টাকা দিয়ে? নিলামের দাম দিয়ে? নাকি স্মৃতি দিয়ে?
হয়তো ইংল্যান্ডের কোনো খেলোয়াড় ম্যাচের আগেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন শেষ বাঁশির পর মেসির কাছে যাবেন। জার্সিটি চাইবেন। হয়তো দুজন একই সময়ে এগিয়ে যাবেন। হয়তো কেউ আগেই অনুরোধ করে রেখেছেন।
একটি জার্সি তো একজনই পাবেন। কে তিনি? ইংল্যান্ডের অধিনায়ক? দলের সবচেয়ে বড় তারকা? কোনো তরুণ ফুটবলার, ছোটবেলায় মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন? এমন কেউ, যার সঙ্গে মেসির মাঠের বাইরে আলাদা সম্পর্ক রয়েছে?
উত্তর এখনো অজানা। যিনিই পান, তিনি হয়তো প্রথমে বুঝতেও পারবেন না কী নিয়ে মাঠ ছাড়ছেন। জার্সিটিতে তখন ঘামের দাগ থাকবে। ঘাসের চিহ্ন থাকতে পারে। নব্বই কিংবা ১২০ মিনিটের যুদ্ধের ক্লান্তি লেগে থাকবে। সময় যত যাবে, সেই দাগগুলোই হয়ে উঠবে ইতিহাসের সাক্ষী।
যদি আর্জেন্টিনা হারে, সেটি হবে বিশ্বকাপে মেসির শেষ পরা জার্সি। ভাবা যায়? যে মানুষটি পাঁচটি বিশ্বকাপ পেরিয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসেছেন, অসংখ্য মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, বিশ্বকাপ জিতেছেন তার বিশ্বকাপ জীবনের শেষ ম্যাচের জার্সি থাকবে অন্য এক ফুটবলারের হাতে। হয়তো বহু বছর পর সেই খেলোয়াড় নিজের সন্তানকে জার্সিটি দেখাবেন। বলবেন, ‘এই জার্সিটি মেসি তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচে পরেছিলেন।’ একটি বাক্যই যথেষ্ট।
মেসি যদি জেতেন? তাহলে জার্সিটির গল্প অন্যরকম হবে। সেটি হবে তার শেষ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের জার্সি। যে জার্সি পরে তিনি শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিলেন। সামনে তখন অপেক্ষা করবে স্পেন। মেসির সামনে থাকবে শেষ অধ্যায়কে আরও একবার রূপকথায় বদলে দেওয়ার সুযোগ। ফল যা-ই হোক, আজকের জার্সিটির গল্প থাকবে। শুধু গল্পের ভাষা বদলে যাবে। হারলে বিদায়ের জার্সি। জিতলে শেষ ফাইনালে ওঠার জার্সি।
একসময় আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরতেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। এখন সেই নম্বরের সঙ্গে মিশে গেছে মেসির নাম। ভবিষ্যতে আবার কেউ ১০ নম্বর পরবেন। ফুটবল থেমে থাকবে না। আর্জেন্টিনাও নতুন তারকা পাবে। তবে মেসির ১০ নম্বর আর ফিরে আসবে না। এই জার্সিতে তার হাসি আছে। কান্না আছে। ব্যর্থতা আছে। বিশ্বজয়ের গল্প আছে। ২০১৪ সালের ফাইনাল হারানোর যন্ত্রণা আছে। ২০২২ সালের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার আনন্দ আছে। ২০২৬ সালে এসে আছে বিদায়ের অপেক্ষা। সেই জার্সির আরেকটি অধ্যায় লেখা হবে।
শেষ বাঁশির পর ক্যামেরাগুলো মেসিকে অনুসরণ করবে। পৃথিবী দেখবে তার মুখ। জিতলে হাসি, হারলে হয়তো শূন্য দৃষ্টি। ঠিক সেই সময় ইংল্যান্ডের কোনো একজন খেলোয়াড় হয়তো তার সামনে দাঁড়াবেন।
দুজন কিছু কথা বলবেন। তারপর মেসি হাত দিয়ে জার্সির নিচের অংশ ধরবেন। মাথার ওপর দিয়ে খুলবেন আকাশি-সাদা ১০ নম্বরটি। এক মুহূর্তের জন্য জার্সিটি থাকবে তার হাতে। তারপর চলে যাবে অন্য কারও কাছে। সেই মুহূর্তে ইতিহাস হাতবদল হচ্ছে।