রাজবাড়ীর পাংশায় অবহেলায় পড়ে থাকা মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশনের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় যাত্রীদের। দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
ফরিদুল আলম ফরিদঃ রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাছপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশন। একসময় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে নানা অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় স্টেশনটির অবস্থা অনেকটাই বেহাল। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই স্টেশন ব্যবহার করলেও যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বাংলাদেশের রেল যোগাযোগের ইতিহাসের সঙ্গে মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশনেরও রয়েছে পুরোনো সম্পর্ক। ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রাণাঘাট পর্যন্ত রেলপথ চালু করে। পরবর্তী সময়ে দর্শনা থেকে জগতী পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হয়। এরপর কুষ্টিয়া (জগতি) থেকে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেলপথ চালু হলে সেই রুটের একটি স্টেশন হিসেবে মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশন গড়ে ওঠে।
দীর্ঘ সময় ধরে এই স্টেশনটি পাংশা ও আশপাশের এলাকার মানুষের রেল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মাছপাড়া স্টেশনের ওপর দিয়ে একাধিক আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করলেও এসব ট্রেনের কোনোটিরই এখানে নিয়মিত যাত্রাবিরতি নেই। ফলে স্থানীয় যাত্রীদের অনেক সময় অন্য স্টেশনে গিয়ে আন্তঃনগর ট্রেনে উঠতে হয়।
অন্যদিকে লোকাল ও কমিউটার ট্রেনের ওপরই মূলত নির্ভর করতে হচ্ছে মাছপাড়া ও আশপাশের এলাকার যাত্রীদের।
বিশেষ করে নকশীকাঁথা কমিউটার ট্রেনটি মাছপাড়া স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও এতে আসন বরাদ্দ না থাকায় যাত্রীদের দাঁড়িয়ে যাতায়াত করতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

স্টেশনের অন্যতম বড় সমস্যা এর নিচু ও অপর্যাপ্ত প্ল্যাটফর্ম। ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্মের উচ্চতার মধ্যে ব্যবধান থাকায় বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ ও চলাচলে সমস্যায় থাকা যাত্রীদের ট্রেনে ওঠানামায় বেশ বেগ পেতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্টেশনের অবকাঠামো আধুনিকায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় প্রতিদিনই একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে যাত্রীদের।
ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত আগাম বার্তা বা আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে নতুন বা অপরিচিত যাত্রীদের জন্য বিষয়টি আরও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্টেশন ভবনের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ময়লা-আবর্জনা, আগাছা ও অযত্নের কারণে স্টেশন ভবন ও আশপাশের পরিবেশ অনেকটাই জরাজীর্ণ বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

পাংশা উপজেলার মাছপাড়া ইউনিয়ন একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল এলাকা। ইউনিয়নে রয়েছে ১৯টি গ্রাম ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কাজে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ উপজেলা সদর ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেন।
রেল যোগাযোগ তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশনটির গুরুত্বও কম নয়। অথচ সেই স্টেশনের অবকাঠামোগত দুরবস্থাই এখন যাত্রীদের জন্য বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সময়ের সঙ্গে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন হচ্ছে। নতুন রেলপথ, আধুনিক স্টেশন ও উন্নত যাত্রীসেবা চালু হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশনের চিত্র যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তাই অবহেলায় পড়ে থাকা এই স্টেশনের দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন, নিরাপদ ও উঁচু প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ, যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নকশীকাঁথা কমিউটার ট্রেনে আসন বরাদ্দের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়টি বিবেচনা করে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনের মাছপাড়া স্টেশনে যাত্রাবিরতির বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মাছপাড়া রেলওয়ে স্টেশন শুধু একটি স্টেশন নয়—এটি পাংশার একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই যাত্রীদের দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সূত্রঃ মাছপাড়া গাঁড়াল গ্রামের বাসিন্দা মালেক রব্বানীর ফেসবুক ওয়াল থেকে তথ্য ও ছবি সংগৃহীত।