মোঃ রাকিবুল ইসলাম খান: ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বরিশাল। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই মসজিদটি বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের উত্তর কড়াপুর গ্রামে অবস্থিত।
দ্বিতলবিশিষ্ট তিন গম্বুজের এই মসজিদটি আজও তার স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক কারুকার্যের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির নির্মাণকাল ১৮শ শতকের শেষভাগ অথবা ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি। এটি মুঘল আমলের শেষভাগ কিংবা ব্রিটিশ শাসনের সূচনালগ্নের স্থাপত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদের ইতিহাসের সঙ্গে স্থানীয় জমিদার হায়াত মাহমুদের নাম জড়িয়ে আছে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণে হায়াত মাহমুদকে প্রিন্স অব ওয়েলস দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
দীর্ঘ ১৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে তিনি এলাকায় দুটি দীঘি খনন এবং এই ঐতিহাসিক দ্বিতল মসজিদ নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। ফলে মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, স্থানীয় ইতিহাস ও ঔপনিবেশিক সময়ের নানা ঘটনারও স্মারক হয়ে আছে।
কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর তিনটি গম্বুজ ও দ্বিতল কাঠামো। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত মসজিদটির বিভিন্ন অংশে রয়েছে নান্দনিক নকশা ও কারুকার্য।
মসজিদের দ্বিতীয় তলায় ওঠার জন্য বাইরে থেকে প্রশস্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধান ফটকসহ দ্বিতীয় তলার বিভিন্ন অংশে অলংকরণ ও নকশার ব্যবহার স্থাপনাটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।
মসজিদটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো নিচতলার কক্ষগুলো। নিচতলায় ছয়টি দরজাসহ কয়েকটি কামরা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এসব কক্ষ অতীতে মাদরাসার কার্যক্রম কিংবা শিক্ষার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এ কারণে মসজিদটি একসময় ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি শিক্ষা ও আবাসিক কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণকৌশল এবং ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ বরিশাল অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি ব্রিটিশ আমলের সূচনালগ্নে নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে একটি।
মসজিদটির স্থাপত্যে মুঘল ঐতিহ্যের প্রভাব এবং পরবর্তী ঔপনিবেশিক সময়ের নির্মাণরীতির সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায় বলে ঐতিহ্যসচেতনদের অনেকে মনে করেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে এর স্থাপত্য ও কারুকার্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নিয়মিত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির যথাযথ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হলে এটি বরিশালের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।
কড়াপুর মিয়াবাড়ি মসজিদ তাই শুধু একটি প্রাচীন মসজিদ নয়-এটি বরিশালের ইতিহাস, স্থাপত্য, ধর্মীয় শিক্ষা ও স্থানীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। শত বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতকে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা হয়ে থাকতে পারে।