আবু আফরান মোঃ নোমান: বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। আয়তনের দিক থেকে অন্তত ১৩টি জেলার চেয়ে বড় এই প্রত্যন্ত ভূখণ্ডটি বরাবরই উত্তপ্ত রাজনৈতিক ময়দান হিসেবে পরিচিত। তবে গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর হাতিয়ার রাজনীতিতে বইতে শুরু করেছে বিতর্কিত এক ভিন্ন হাওয়া।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের তীব্র ক্ষোভ ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিস্ফোরক তথ্য—বিগত ১৭ বছর ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে সুবিধা ভোগ করা একটি বিতর্কিত সিন্ডিকেট এখন কোটি টাকার বিনিময়ে হাতিয়া বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে ভর করার চক্রান্তে মেতেছে।
মরহুম আমীরুল ইসলাম কালামের পর প্রকৌশলী মো. ফজলুল আজিম হাতিয়ায় বিএনপির রাজনীতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু গত প্রায় দেড় দশকে সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম দমন-পীড়নে তছনছ হয়ে যায় তৃণমূল বিএনপি।
এই দীর্ঘ সময়ে রাজপথের একাংশ ত্যাগী নেতাকর্মী মামলা, হামলা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনোমতে রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখেন। তাদের একটি বড় অংশ ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকার দলীয় কার্যালয়ের আশপাশে ভাড়া বাসায় নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে রাখার অজুহাতে অন্য একটি অংশ মোহাম্মদ আলী ও তৎকালীন জেলা রাজনীতির প্রভাবশালী এমপি একরামুল করিম চৌধুরীর সাথে আঁতাত করে রাতারাতি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক বনে যায়।
হাতিয়ার রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র ‘প্রিন্স কামাল’। রূপ বদলের রাজনীতিতে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মরহুম আমীরুল ইসলাম কালামের হাত ধরে বিএনপিতে এলেও পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। এমনকি ১৯৮৯ সালে শেখ হাসিনাকে ‘স্বর্ণের নৌকা’ উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগে ভেড়েন এই নেতা।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রিন্স কামাল তাঁর ছেলে সাবেক উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি প্রিন্স রাশেদ, ভাগিনা রাহাত চৌধুরী এবং সাবেক কলেজ ভিপি সাজ্জাদকে জেলা আওয়ামী লীগের ক্ষমতার কেন্দ্রে সমর্পণ করেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই তিনজনের সাথে একরামুল করিম চৌধুরীর আরেক অনুসারী ‘জাবেদ’ যুক্ত হয়ে তৈরি হয় এক শক্তিশালী চতুরঙ্গ সিন্ডিকেট। গত ১৭ বছর ধরে পুরো নোয়াখালী জেলার প্রায় ৭৫ শতাংশ সরকারি ঠিকাদারি কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে এই গোষ্ঠী।
বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় টানা কয়েক বছর সেরা করদাতার পুরস্কার পায় এই সিন্ডিকেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগের বড় বড় সমাবেশসহ তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের নোয়াখালী সফরের সমুদয় খরচ বহন করত এই চক্রটি। ক্ষমতার দাপটে নোয়াখালী হাউজিংয়ের ১৭টি মূল্যবান প্লট এবং নোয়াখালী সুপার মার্কেটের আলিফ রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনে যায় তারা।
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ক্ষমতার অক্ষ বদলাতে থাকে। পরিস্থিতির চাপে সিন্ডিকেটের সদস্য রাহাত চৌধুরী ঢাকায় আত্মগোপন করেন এবং জাবেদ অসুস্থতার অজুহাতে ঢাকা ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান নেন।
তবে রাতারাতি খোলস পাল্টে ফেলেন প্রিন্স রাশেদ ও ভিপি সাজ্জাদ। সাবেক ছাত্রদল পরিচয়ের দোহাই দিয়ে এবং বিপুল অর্থ ছিটিয়ে জেলা ও উপজেলার কতিপয় সুবিধাবাদী নেতার ছত্রছায়ায় তারা হঠাৎ বিএনপির প্রথম সারিতে আবির্ভূত হয়েছেন।
"কুত্তা চায় হাড্ডি, আর সুবিধাবাদী নেতারা চায় টাকা—আজ রাজনীতির মাঠে এই তিক্ত সত্যই প্রতিফলিত হচ্ছে।" — তৃণমূলের এক ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতার ক্ষোভপ্রকাশ।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে রক্ত দেওয়া ও জেল-জুলুম সহ্য করা ত্যাগী কর্মীরা আজ চরম দিশেহারা। টাকার বিনিময়ে ত্যাগীদের ত্যাগ ও শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসনের এই প্রক্রিয়া হাতিয়া বিএনপির মূল ভিত্তিকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তৃণমূলের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি—কোনো আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যদি এই লুটেরাদের দলে পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে প্রমাণাদিসহ বিষয়টি সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টিগোচর করা হবে। হাতিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দলকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ।